Cadbury Report (1992): আধুনিক কর্পোরেট গভর্নেন্সের ভিত্তি
03 অক্টো 2026 তারিখে প্রকাশিত
১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন আজও বিশ্বের অধিকাংশ কর্পোরেট গভর্নেন্স কোডের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। রিপোর্ট অফ দ্য কমিটি অন দ্য ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসপেক্টস অফ কর্পোরেট গভর্নেন্স নামে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচিত এই প্রতিবেদনটি সবার কাছে পরিচিত এর প্রধান স্যার অ্যাড্রিয়ান ক্যাডবেরির নামে, Cadbury Report হিসেবে। এই লেখায় আমরা দেখব কেন এই প্রতিবেদন তৈরি হয়েছিল এবং কীভাবে এটি আজকের গভর্নেন্স চর্চাকে প্রভাবিত করছে। পুরো ইতিহাসের বড় প্রেক্ষাপট পেতে পড়তে পারেন বিশ্বে কর্পোরেট গভর্নেন্সের ইতিহাস শীর্ষক লেখাটি।
কেন এই প্রতিবেদনের প্রয়োজন হয়েছিল
আশির দশকের শেষ ভাগ এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যুক্তরাজ্যে একের পর এক বড় প্রতিষ্ঠানের পতন ঘটে, যেমন পলি পেক ইন্টারন্যাশনাল, ব্যাংক অফ ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল এবং রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের মিডিয়া সাম্রাজ্য। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আর্থিক প্রতিবেদনে এমন সব সমস্যা ছিল যা সময়মতো ধরা পড়েনি, বোর্ডে কার্যকর স্বাধীন তদারকির অভাব ছিল। বিনিয়োগকারীদের আস্থা তখন তলানিতে, আর লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল এবং হিসাবরক্ষণ পেশাজীবী সংস্থাগুলো একসাথে উদ্যোগী হয়ে একটি কমিটি গঠন করে।
গল্পে বলি
কল্পনা করুন, ১৯৯০ সালের লন্ডনে একজন পেনশন তহবিল ব্যবস্থাপক সংবাদপত্রে পড়ছেন কীভাবে একটি বড় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান একই সাথে প্রধান নির্বাহীও ছিলেন, এবং কোম্পানির আর্থিক হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরও কেউ কার্যকরভাবে তাকে প্রশ্ন করার অবস্থানে ছিলেন না। তার তহবিলের লাখ লাখ পাউন্ড সেই কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা ছিল। এমন অসংখ্য ব্যবস্থাপকের একই উদ্বেগ থেকেই চাপ তৈরি হয়, যার ফলে ক্যাডবেরি কমিটি গঠিত হয়।
কমিটির সুপারিশ, কোড অফ বেস্ট প্র্যাকটিস
Cadbury Report এর মূল অবদান ছিল একটি কোড অফ বেস্ট প্র্যাকটিস তৈরি করা, যা মূলত চারটি ক্ষেত্রে বিভক্ত ছিল, বোর্ড অফ ডিরেক্টরস, নন-এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর এবং রিপোর্টিং ও নিয়ন্ত্রণ। প্রতিটি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দেওয়া হয়, যেমন চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীর পদ আলাদা রাখা উচিত, বোর্ডে পর্যাপ্তসংখ্যক স্বাধীন নন-এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর থাকা উচিত এবং একটি কার্যকর অডিট কমিটি গঠন করা উচিত। আমাদের কর্পোরেট গভর্নেন্স কী তা নিয়ে মূল লেখায় এই ধারণাগুলো আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
| বিষয় | মান |
|---|---|
| বোর্ড অফ ডিরেক্টরস | ১ |
| নন-এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর | ১ |
| এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর | ১ |
| রিপোর্টিং ও নিয়ন্ত্রণ | ১ |
কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন, একটি নমনীয় কিন্তু শক্তিশালী ধারণা
Cadbury Report এর সবচেয়ে স্থায়ী অবদান সম্ভবত কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন নীতি। এর অর্থ হলো, কোম্পানিকে আইন করে কঠোরভাবে বাধ্য করা হয় না প্রতিটি সুপারিশ হুবহু মানতে, বরং তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে বলা হয়, হয় কোডের সুপারিশ মেনে চলো, নয়তো কেন মানছ না তা বার্ষিক প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করো। এই পদ্ধতি বাজারের শৃঙ্খলাকে কাজে লাগায়, কারণ শেয়ারহোল্ডাররা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ব্যাখ্যাটি গ্রহণযোগ্য কিনা।
আপনি কি জানেন, বাংলাদেশের BSEC কর্পোরেট গভর্নেন্স কোডও একই নীতির ছায়ায় তৈরি?
হ্যাঁ, ২০১৮ সালের BSEC কোডের অনেক ধারাও কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন কাঠামোতে তৈরি, যদিও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই পদ্ধতিটি মূলত Cadbury Report থেকে ধার করা একটি আন্তর্জাতিক মডেল, যা পরবর্তীতে বিশ্বের অসংখ্য দেশের গভর্নেন্স কোডে অনুসরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের নিজস্ব যাত্রাপথ নিয়ে পড়তে পারেন বাংলাদেশে কর্পোরেট গভর্নেন্সের যাত্রা শীর্ষক লেখায়।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
Cadbury Report প্রকাশের পর যুক্তরাজ্যে এটি ধীরে ধীরে কম্বাইন্ড কোড অন কর্পোরেট গভর্নেন্সে রূপান্তরিত হয়, যা পরে যুক্তরাজ্যের বর্তমান কর্পোরেট গভর্নেন্স কোডে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব শুধু যুক্তরাজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ১৯৯৯ সালের OECD নীতিমালা তৈরির সময়ও এই প্রতিবেদনের ধারণাগুলো বড় প্রভাব ফেলেছিল।
গল্পে বলি
একজন কল্পিত কোম্পানি সচিবের কথা ভাবুন, যিনি ১৯৯৩ সালে প্রথমবারের মতো বার্ষিক প্রতিবেদনে একটি নতুন অনুচ্ছেদ যোগ করছেন, যেখানে লেখা, আমাদের বোর্ড Cadbury কোডের সুপারিশ কতটা মেনেছে তার বিবরণ। তার কাছে এটি প্রথমে বাড়তি কাগজের কাজ মনে হয়েছিল, কিন্তু কয়েক বছর পর তিনি লক্ষ্য করেন যে বিনিয়োগকারীরা এখন এই অংশটি মনোযোগ দিয়ে পড়েন, এবং ভালো ব্যাখ্যা থাকা কোম্পানিগুলো বাজারে বাড়তি আস্থা পাচ্ছে।
উপসংহার
Cadbury Report কোনো আইন ছিল না, ছিল একটি প্রতিবেদন মাত্র, কিন্তু এর চিন্তাভাবনা এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে আজও বিশ্বের প্রায় প্রতিটি কর্পোরেট গভর্নেন্স কোডে এর ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। স্বাধীন পরিচালক, পৃথক চেয়ারম্যান ও সিইও পদ, অডিট কমিটি এবং কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন, এই ধারণাগুলো যতদিন কর্পোরেট জগৎ থাকবে, ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে। পুরো সময়রেখাটি একসাথে দেখতে পড়ুন বিশ্বে কর্পোরেট গভর্নেন্সের ইতিহাস শীর্ষক লেখাটি।
প্রশ্নোত্তর
Cadbury Report কে তৈরি করেছিলেন?
যুক্তরাজ্যের ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল, লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ এবং হিসাবরক্ষণ পেশাজীবী সংস্থাগুলোর উদ্যোগে গঠিত একটি কমিটি, যার প্রধান ছিলেন স্যার অ্যাড্রিয়ান ক্যাডবেরি।
Cadbury Report কবে প্রকাশিত হয়?
১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে।
কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন নীতি কী?
এই নীতি অনুযায়ী কোম্পানিকে হয় গভর্নেন্স কোডের সুপারিশ মেনে চলতে হয়, নয়তো না মানার কারণ বার্ষিক প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়।
Cadbury Report কি শুধু যুক্তরাজ্যেই প্রভাব ফেলেছে?
না, এর ধারণাগুলো OECD নীতিমালাসহ বিশ্বের অসংখ্য দেশের কর্পোরেট গভর্নেন্স কোডে, বাংলাদেশের BSEC কোডসহ, প্রভাব ফেলেছে।