ICSB (Institute of Chartered Secretaries of Bangladesh) এর ভূমিকা
04 অক্টো 2026 তারিখে প্রকাশিত
আমাদের কোম্পানি সেক্রেটারির ডায়েরি নিয়ে লেখায় দেখা গেছে এই পদের দায়িত্ব কতটা বিস্তৃত, কোরাম যাচাই থেকে শুরু করে মিনিটস লেখা পর্যন্ত। কিন্তু একজন ব্যক্তি কীভাবে "কোম্পানি সেক্রেটারি" হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন, কে তাকে প্রশিক্ষণ দেয়, এবং কে নিশ্চিত করে তিনি পেশাগতভাবে যথেষ্ট দক্ষ? বাংলাদেশে এই দায়িত্ব পালন করে ICSB, পূর্ণ নাম Institute of Chartered Secretaries of Bangladesh। এই লেখায় আমরা দেখব ICSB আসলে কী, কীভাবে কাজ করে এবং কর্পোরেট গভর্নেন্স কাঠামোয় এর গুরুত্ব কোথায়।
ICSB কী এবং কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল
ICSB হলো বাংলাদেশের একমাত্র পেশাজীবী সংস্থা, যা একটি সংসদীয় আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কোম্পানি সেক্রেটারি পেশাকে নিয়ন্ত্রণ, মান নির্ধারণ এবং বিকাশের দায়িত্ব নিয়ে। এর আগে বাংলাদেশে কোম্পানি সেক্রেটারির দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় পেশাগত সনদ ছিল না, ফলে এই পদে নিয়োগ হতো মূলত প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, কোনো প্রমিত যোগ্যতা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নয়। ICSB এই ফাঁক পূরণ করে একটি জাতীয় মানদণ্ড তৈরি করে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের চার্টার্ড সেক্রেটারি প্রতিষ্ঠানের আদলেই গড়া।
ACS ও FCS, সনদের দুটি স্তর
ICSB এর সদস্যপদ দুটি স্তরে বিভক্ত। একজন প্রার্থী প্রথমে নির্ধারিত পরীক্ষাগুলোতে উত্তীর্ণ হয়ে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ শেষ করে একজন অ্যাসোসিয়েট চার্টার্ড সেক্রেটারি বা ACS হন। পরে যথেষ্ট পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জনের পর তিনি ফেলো চার্টার্ড সেক্রেটারি বা FCS উপাধিতে উন্নীত হতে পারেন। এই দুটি উপাধিই মূলত প্রমাণ করে, ধারক ব্যক্তি কোম্পানি আইন, সিকিউরিটিজ প্রবিধান, কর্পোরেট গভর্নেন্স এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি প্রমিত পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করেছেন।
গল্পে বলি
একটি মাঝারি আকারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে হিসাব বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কোম্পানি সেক্রেটারির কাজ করাচ্ছিল, যদিও তার কোনো আনুষ্ঠানিক সনদ ছিল না। একবার একটি জটিল শেয়ার হস্তান্তর এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক ফাইলিংয়ে ভুল হয়ে যায়, কারণ তিনি সংশ্লিষ্ট আইনি সময়সীমা এবং প্রয়োজনীয় ফর্মের খুঁটিনাটি সঠিকভাবে জানতেন না। এই ভুলের কারণে কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জবাবদিহি করতে হয় এবং একটি সংশোধনী ফাইলিং জমা দিতে হয়।
এই অভিজ্ঞতার পর বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয়, একজন ICSB থেকে যোগ্যতাপ্রাপ্ত ACS সনদধারী ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হবে। নতুন কোম্পানি সেক্রেটারি যোগদানের পরের বছরেই ফাইলিং প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল হয়নি, এবং তিনি একাধিক সময়সংবেদনশীল নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা আগেভাগে চিহ্নিত করে বোর্ডকে সতর্ক করতে সক্ষম হন।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, "কোম্পানি সেক্রেটারি" আর "প্রশাসনিক কর্মকর্তা"-র মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য কোথায়?
পার্থক্যটা মূলত প্রমিত পেশাগত পাঠ্যক্রমে। একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা অভিজ্ঞতা থেকে শেখেন, কিন্তু একজন ICSB সনদধারী কোম্পানি সেক্রেটারি কোম্পানি আইন, সিকিউরিটিজ প্রবিধান ও গভর্নেন্স কোডের একটি প্রমিত পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে আসেন, যা তার জ্ঞানের একটি যাচাইযোগ্য ভিত্তি তৈরি করে।
ICSB এর মূল কাজ
ICSB এর কাজ কেবল পরীক্ষা নেওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর দায়িত্ব কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা যায়।
- শিক্ষা ও পরীক্ষা পরিচালনা। কোম্পানি আইন, সিকিউরিটিজ প্রবিধান, গভর্নেন্স ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ওপর প্রমিত পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা পরিচালনা করা।
- অব্যাহত পেশাগত শিক্ষা। সনদপ্রাপ্ত সদস্যদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও আপডেট আয়োজন করা, যাতে তারা পরিবর্তিত আইন ও প্রবিধানের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারেন।
- পেশাগত শৃঙ্খলা। সদস্যদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করা এবং গুরুতর অসদাচরণের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
- নীতিনির্ধারণে পরামর্শ। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে কোম্পানি সেক্রেটারি সংক্রান্ত নিয়মকানুন প্রণয়নে কারিগরি পরামর্শ দেওয়া।
| বিষয় | ধাপ |
|---|---|
| ICSB-তে ভর্তি | ১ |
| পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া | ২ |
| বাধ্যতামূলক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ | ৩ |
| ACS সনদ প্রাপ্তি | ৪ |
| অভিজ্ঞতার পর FCS-তে উন্নীত হওয়া | ৫ |
আইনি কাঠামোয় কোম্পানি সেক্রেটারির ভূমিকা
বিএসইসি কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড-২০১৮ অনুযায়ী প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে কোম্পানি সেক্রেটারি চারটি মূল পদের একটি, যার বাকি তিনটি হলো এমডি বা সিইও, সিএফও এবং হেড অব ইন্টারনাল অডিট। কোড স্পষ্টভাবে বলে এই চারটি পদ চারজন আলাদা ব্যক্তির হাতে থাকতে হবে। কোম্পানি সেক্রেটারি একইসাথে অডিট কমিটি এবং নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটি দুটোরই সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন, অর্থাৎ বোর্ডের প্রশাসনিক সমন্বয়ের একটি বড় অংশ তার হাতেই থাকে।
“এমডি বা সিইও, কোম্পানি সেক্রেটারি, সিএফও এবং হেড অব ইন্টারনাল অডিট অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স, এই চারটি পদ চারজন আলাদা ব্যক্তিকে দিতে হবে।”
কোম্পানিগুলো সাধারণত যেসব ভুল করে
-
1
সনদহীন ব্যক্তিকে কোম্পানি সেক্রেটারির দায়িত্ব দেওয়া
প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রমিত পাঠ্যক্রমের অভাবে জটিল আইনি সময়সীমা বা ফাইলিং প্রক্রিয়ায় ভুল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
-
2
কোম্পানি সেক্রেটারিকে অন্য কোনো নির্বাহী পদের সাথে একীভূত করা
কন্ডিশন ৩(১)(খ) অনুযায়ী এই পদ অন্য তিনটি মূল পদ থেকে আলাদা রাখতে হবে, নইলে স্বাধীন প্রশাসনিক তদারকি ব্যাহত হয়।
-
3
অব্যাহত পেশাগত শিক্ষায় অংশ না নেওয়া
আইন ও প্রবিধান নিয়মিত পরিবর্তিত হয়, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ছাড়া পুরনো জ্ঞান নিয়ে কাজ করলে ঝুঁকি বাড়ে।
-
4
কোম্পানি সেক্রেটারির মতামতকে প্রশাসনিক মনে করে উপেক্ষা করা
এই পদের মতামত আসলে আইনি ও গভর্নেন্স ঝুঁকি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হতে পারে।
বাস্তব কেস স্টাডি
কেস স্টাডি
ফাইলিং সময়সীমা মিস হওয়ার ঝুঁকি
প্রেক্ষাপট: এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক কাল্পনিক দৃশ্যকল্প, যেখানে একটি কোম্পানি একজন অসনদধারী ব্যক্তিকে কোম্পানি সেক্রেটারির দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিল এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবিধিবদ্ধ ফাইলিংয়ের সময়সীমা পার হয়ে যায়।
সমস্যা: সময়সীমা মিস হওয়ায় কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে ব্যাখ্যা দিতে হয় এবং সংশোধনী ফাইলিং জমা দিতে হয়, যা কোম্পানির সুনামে একটি নেতিবাচক ছাপ ফেলে।
সমাধান: কোম্পানি একজন ICSB-সনদধারী ACS নিয়োগ দেয় এবং একটি ডিজিটাল ফাইলিং ক্যালেন্ডার চালু করে, যা ভবিষ্যতে সময়সীমা মিস হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আপনার প্রতিষ্ঠানের কোম্পানি সেক্রেটারি সর্বশেষ কবে কোনো পেশাগত প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর অনেক প্রতিষ্ঠানেই অজানা থেকে যায়, যদিও আইন ও প্রবিধানের ধারাবাহিক পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য নিয়মিত অব্যাহত পেশাগত শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
উপসংহার
ICSB বাংলাদেশের কর্পোরেট গভর্নেন্স কাঠামোর একটি প্রায়ই অদৃশ্য কিন্তু অপরিহার্য স্তম্ভ, যা কোম্পানি সেক্রেটারি পেশাকে একটি প্রমিত, যাচাইযোগ্য ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। ICAB ও কর্পোরেট গভর্নেন্স রিপোর্টিং নিয়ে আমাদের পরের লেখায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী সংস্থার ভূমিকা আলোচনা করা হয়েছে। কোম্পানি সেক্রেটারির ডায়েরি থেকে এই পদের বাস্তব দিনলিপিও পড়তে পারেন। কর্পোরেট গভর্নেন্স কী তা নিয়ে বিস্তারিত পড়তে চাইলে আমাদের গভর্নেন্স বিভাগে ঘুরে আসতে পারেন।
প্রশ্নোত্তর
ICSB এর পূর্ণ নাম কী?
Institute of Chartered Secretaries of Bangladesh, বাংলাদেশের একমাত্র জাতীয় চার্টার্ড সেক্রেটারি পেশাজীবী সংস্থা।
ACS ও FCS এর মধ্যে পার্থক্য কী?
ACS হলো সদস্যপদের প্রাথমিক স্তর, যা পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ শেষে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জনের পর একজন সদস্য ফেলো বা FCS উপাধিতে উন্নীত হতে পারেন।
কোম্পানি সেক্রেটারি কি শুধু তালিকাভুক্ত কোম্পানিতেই প্রয়োজন?
কোড-২০১৮ এর নির্দিষ্ট শর্তটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য, কিন্তু কোম্পানি আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট মূলধন সীমার বেসরকারি কোম্পানিতেও এই পদ প্রয়োজন হতে পারে।
কোম্পানি সেক্রেটারি কি বোর্ড মিটিংয়ে উপস্থিত থাকতে হয়?
হ্যাঁ, সাধারণত তিনি সভার আয়োজন, নোটিস, এজেন্ডা এবং মিনিটস তৈরির দায়িত্বে থাকেন এবং সভায় উপস্থিত থাকেন।
কোম্পানি সেক্রেটারি কি অডিট কমিটির সদস্য হতে পারেন?
না, তিনি অডিট কমিটির সদস্য নন, বরং কমিটির সেক্রেটারি হিসেবে প্রশাসনিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
ICSB কি সরকারি সংস্থা?
না, এটি একটি স্বশাসিত পেশাজীবী সংস্থা, যা একটি সংসদীয় আইনের মাধ্যমে আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে।
একজন বিদেশি চার্টার্ড সেক্রেটারি কি বাংলাদেশে সরাসরি কাজ করতে পারেন?
সাধারণত স্থানীয় আইন ও প্রবিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান প্রয়োজন হয়, তাই অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সনদ বা সমতুল্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
কোম্পানি সেক্রেটারির পদ শূন্য হলে কত দ্রুত পূরণ করতে হয়?
কোড অনুযায়ী মূল পদগুলোর কোনোটি শূন্য হলে যত দ্রুত সম্ভব যোগ্য ব্যক্তি নিয়োগ দিতে হয়, যাতে প্রশাসনিক ও গভর্নেন্স কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।
মূল বিষয়সমূহ
- ●ICSB বাংলাদেশের একমাত্র জাতীয় চার্টার্ড সেক্রেটারি পেশাজীবী সংস্থা, যা একটি সংসদীয় আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত।
- ●ACS ও FCS দুটি স্তরের সনদ একজন কোম্পানি সেক্রেটারির পেশাগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রমাণ দেয়।
- ●কোম্পানি সেক্রেটারি কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড-২০১৮ এর চারটি মূল পদের একটি, এবং অন্য তিনটি থেকে আলাদা ব্যক্তি হতে হয়।
- ●তিনি অডিট কমিটি ও নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটি দুটোরই সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন।
- ●অসনদধারী ব্যক্তিকে এই দায়িত্ব দেওয়া ফাইলিং ও নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতায় ভুলের ঝুঁকি বাড়ায়।
- ●ICSB এর অব্যাহত পেশাগত শিক্ষা কর্মসূচি কোম্পানি সেক্রেটারিদের পরিবর্তিত আইন ও প্রবিধানের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে সাহায্য করে।